এই তারিখে
গোল্ডেন রেকর্ড
বার্তা
ভয়েজার
মহাকাশ
মানব সভ্যতা
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
দিল্লির সাউথ ব্লকের কনফারেন্স রুমে তখন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। সামরিক বিশ্লেষকদের একটি দল বিশাল মানচিত্রের দিকে ঝুঁকে আলোচনা করছে – যদি বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধ বাঁধে তবে কী ঘটতে পারে?
এক তরুণ বিশ্লেষক আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, "আমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি। বাংলাদেশ আমাদের সামনে টিকবে কী করে?"
কিন্তু অভিজ্ঞ জেনারেল, যিনি এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিলেন, ধীরে ধীরে ঝুঁকে ঠান্ডা গলায় বললেন, "এই ভুল ভাবনা তোমাদের ধ্বংস ডেকে আনবে। বাংলাদেশ ভুগবে ঠিকই, কিন্তু ভারত টুকরো হয়ে যাবে মুহূর্তের মধ্যে।"
ঘরে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক গঠন যেকোনো আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য একটি দুঃস্বপ্ন। দেশটির ৭০ শতাংশ এলাকা নদী, খাল, বিল এবং নিচু জমি দিয়ে ঘেরা। পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ সুন্দরবনের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে অবস্থিত। এই জলাভূমি এবং কাদামাটির ভূমি ভারী ট্যাঙ্ক, কামান বা যুদ্ধযানের জন্য দুর্গম। মৌসুমী বৃষ্টি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, যা রাস্তাঘাটকে কাদার সাগরে পরিণত করে।
ইতিহাস সাক্ষী, মুঘল সম্রাটরাও বাংলাকে কখনো পুরোপুরি শাসন করতে পারেননি। ১৬০০ থেকে ১৮০০ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলার সুবাহ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ও এই অঞ্চলের গ্রামগুলোতে পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিল। পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে হাঁটু গেড়ে বসানো এই ইতিহাস প্রমাণ করে বাংলাদেশের ভূমি এবং জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা অপরিসীম।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। ভারতের জিডিপি বর্তমানে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। কিন্তু যুদ্ধের ছায়া এই স্বপ্নকে ছাই করে দিতে পারে।
একটি যুদ্ধ মানে বিপুল আর্থিক ব্যয়। ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট বর্তমানে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই ব্যয় দ্বিগুণ বা তিনগুণ হতে পারে। রুপির মূল্য হ্রাস পাবে, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা পিছু হটবে এবং শেয়ার বাজারে মন্দা দেখা দেবে। যুদ্ধের ফলে বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাবে, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে। এটি ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যে বিশাল ধাক্কা দেবে, যা দেশের অর্থনীতির ২০ শতাংশেরও বেশি।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক গত দুই দশকে অভূতপূর্বভাবে শক্তিশালী হয়েছে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী। ২০২৩ সালের হিসাবে, চীন বাংলাদেশে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর এবং চট্টগ্রাম নৌঘাটির আধুনিকীকরণ। চীন বাংলাদেশকে উন্নত যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
যুদ্ধের পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিয়ে চীন হয়তো অরুণাচল প্রদেশ বা সিকিমে সামরিক তৎপরতা বাড়াবে। এটি ভারতকে দুই ফ্রন্টের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলবে, যা ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করবে। ইতিহাস বলে, এই ধরনের দ্বি-ফ্রন্ট যুদ্ধে জয়লাভ প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি এই ভুল করেছিল এবং তার ফল ছিল বিধ্বংসী।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য – আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা – সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের সবচেয়ে দুর্বল অঞ্চল। এই অঞ্চল মূল ভারতের সঙ্গে মাত্র ৪০ কিলোমিটার চওড়া চিকেন নেক করিডর দিয়ে সংযুক্ত। এই সরু করিডর বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থিত এবং যুদ্ধের সময় এটি সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
চীন এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। একটি সমন্বিত হামলার মাধ্যমে চীন এই করিডর দখল করে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে মূল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। একই সঙ্গে অরুণাচল প্রদেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই অঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যা ভারতের জন্য অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয় ফ্রন্টে চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নত হলেও এটি মূলত সুবিধাভিত্তিক। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য শক্তি হিসেবে দেখলেও ভারতের দ্রুত উত্থানকে তারা ভবিষ্যতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। যদি ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়, যুক্তরাষ্ট্র তা থামানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে উসকে দিতে পারে। কাশ্মীরে পাকিস্তান সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যা ভারতের পশ্চিম সীমান্তে নতুন ফ্রন্ট খুলে দেবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ, ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এটি ভারতকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে ফেলবে।
যুদ্ধ কখনো শুধু অস্ত্র দিয়ে জেতা যায় না। আমেরিকা ভিয়েতনামে হেরেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে টিকতে পারেনি, কারণ ছিল ভূমির মালিকানা এবং জনগণের অদম্য মনোবল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ এই শিক্ষা বিশ্বকে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল। আজও বাংলাদেশের জনগণ তেমনি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। গ্রামের মাটি, নদীর জল এবং মানুষের ঐক্য – এগুলো কোনো অস্ত্রের কাছে হার মানে না।
দিল্লির কনফারেন্স রুমে আলোচনা থেমে গেছে। সবার চোখ মানচিত্রের দিকে। বাংলাদেশের আকার ছোট, কিন্তু তার প্রতিরোধ শক্তি অপরিসীম। অভিজ্ঞ জেনারেল উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, "বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ মানে ভারতের অস্তিত্বের লড়াই। আমরা কি এই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?"
রাত গভীর হয়। সীমান্তের ওপারে পাখিরা উড়ে যায়। তারা যুদ্ধ চায় না, তারা শান্তি চায়। কিন্তু বাতাসে তখনও ঝুলে আছে একটি প্রশ্ন – শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোদি কি শান্তি বেছে নেবে?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Thank you for your presence.